কেন বারবার রিজেক্ট হচ্ছে? AdSense Approve না হওয়ার আসল কারণ এবং ১০০% কার্যকরী সমাধান

 

আসসালামু আলাইকুম। একজন নতুন ব্লগার যখন অনেক আশা নিয়ে একটা ওয়েবসাইট শুরু করেন, তার প্রথম এবং প্রধান স্বপ্ন থাকে ‘Google AdSense’। পকেটে প্রথম ডলার আসার আনন্দই আলাদা। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন দিনের পর দিন পরিশ্রম করে আর্টিকেল লিখে অ্যাডসেন্সে অ্যাপ্লাই করার পর মেইলে আসে সেই চিরচেনা মেসেজ— "Unfortunately, your site isn't ready to show ads."

বিশ্বাস করুন, এই রিজেকশন মেসেজটা দেখলে মনটা ভেঙে যায়। মনে হয় গুগল হয়তো আমাকে পছন্দ করে না! কিন্তু বাস্তবতা হলো, গুগল আপনাকে চেনে না, চেনে আপনার কাজকে। আপনি যদি নিয়ম না মেনে শুধু কপি-পেস্ট আর তাড়াহুড়ো করেন, তবে অ্যাডসেন্স পাওয়া আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

আজকের এই বিশাল আর্টিকেলে আমি আমার কয়েক বছরের ব্লগিং অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের জানাবো কেন আপনার সাইট রিজেক্ট হচ্ছে এবং কীভাবে এই বাধা কাটিয়ে আপনিও সফলভাবে অ্যাডসেন্স অ্যাপ্রুভ করিয়ে নিতে পারেন।

## Google AdSense কী এবং কেন এটি আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

সহজ কথায়, গুগল অ্যাডসেন্স হলো বিশ্বের সবথেকে বড় অ্যাড নেটওয়ার্ক। এটি আপনার ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেখানোর বিনিময়ে আপনাকে টাকা দেয়। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এটি বিশ্বাসযোগ্য, সময়মতো পেমেন্ট দেয় এবং এর বিজ্ঞাপনের মান অনেক উন্নত। একটি ছোট ব্লগকে প্রফেশনাল আয়ের উৎসে পরিণত করার জন্য অ্যাডসেন্সের কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে।

## AdSense Approval Requirements: অফিসিয়াল বনাম প্র্যাকটিক্যাল

গুগল তার অফিসিয়াল গাইডলাইনে অনেক কিছুই বলে, তবে অভিজ্ঞ ব্লগাররা জানেন যে সেখানে কিছু "সিক্রেট" বিষয় থাকে যা সরাসরি কোথাও লেখা নেই।

**১. অফিসিয়াল রিকোয়ারমেন্ট:**

 * আপনার বয়স ১৮ বছর হতে হবে।

 * সাইট গুগলের পাবলিশার পলিসি মেনে চলতে হবে।

 * সাইটটি অন্তত ৬ মাস পুরনো হতে হবে (এটি মূলত ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্য আগে বলা হতো, তবে এখন মানসম্মত সাইট হলে ১ মাসেও পাওয়া যায়)।

**২. প্র্যাকটিক্যাল রিকোয়ারমেন্ট:**

 * ইউনিক এবং ভ্যালু-অ্যাডেড কন্টেন্ট।

 * প্রফেশনাল এবং ইউজার ফ্রেন্ডলি থিম।

 * প্রয়োজনীয় পেজ (Privacy Policy, About Us, ইত্যাদি)।

 * অন্তত ২০-২৫টি ভালো মানের আর্টিকেল।

## AdSense Approve না হওয়ার আসল কারণসমূহ (বিস্তারিত আলোচনা)

নিচে আমি সেই কারণগুলো তুলে ধরছি যেগুলোর জন্য ৯৯% ব্লগার অ্যাডসেন্স থেকে রিজেকশন পান।

### ১. Low Quality বা Thin Content (সবচেয়ে বড় কারণ)

বর্তমানে অ্যাডসেন্স রিজেকশনের প্রধান কারণ হলো "Low Value Content"। অনেকেই ভাবেন ২০টা আর্টিকেল লিখলেই বুঝি অ্যাডসেন্স পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনি যদি এমন বিষয়ে লেখেন যা ইন্টারনেটে লাখ লাখ আছে (যেমন: "কিভাবে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলবেন"), তবে গুগল সেটাকে ভ্যালু দেয় না।

forumbd24.com

**সমাধান:** আর্টিকেল হতে হবে তথ্যবহুল। অন্তত ৮০০ থেকে ১০০০ শব্দের আর্টিকেল লিখুন। মানুষের সমস্যার সমাধান দিন।

### ২. কপিরাইট কন্টেন্ট বা Plagiarism

অন্যের সাইট থেকে লেখা কপি করে আনলে গুগল সেটা সেকেন্ডের মধ্যে ধরে ফেলে। আপনি যদি লেখা একটু এদিক-সেদিক করে (Spinning) লিখে পাবলিশ করেন, তবুও লাভ নেই। গুগল এখন অনেক স্মার্ট।

**সমাধান:** নিজের ভাষায় লিখুন। ভুল হোক, তাও নিজের হোক। অন্যের ছবি ব্যবহার করলে ক্রেডিট দিন বা কপিরাইট ফ্রি সাইট (যেমন Pixabay) থেকে ছবি নিন।

### ৩. পর্যাপ্ত আর্টিকেল না থাকা

অনেকেই ৫-৬টি আর্টিকেল লিখেই অ্যাপ্লাই করে বসেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল। একটি নতুন সাইটের জন্য গুগলের কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে হয় যে আপনি নিয়মিত কাজ করছেন।

**সমাধান:** অন্তত ২০ থেকে ২৫টি ইউনিক আর্টিকেল পাবলিশ করার পর অ্যাপ্লাই করুন। প্রতিটি আর্টিকেলে যেন যথেষ্ট তথ্য থাকে।

### ৪. ওয়েবসাইটের ডিজাইন ও নেভিগেশন

আপনার সাইট যদি দেখতে এলোমেলো হয়, মেনু বার না থাকে, অথবা ইউজার যদি এক পেজ থেকে অন্য পেজে সহজে যেতে না পারে, তবে গুগল কখনোই আপনাকে অ্যাড দেবে না।

**সমাধান:** একটি ক্লিন এবং ফাস্ট লোডিং থিম ব্যবহার করুন (যেমন GeneratePress বা Astra)। মেনুতে ক্যাটাগরিগুলো সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখুন।

### ৫. প্রয়োজনীয় পেজগুলো না থাকা

আপনার সাইটে যদি আপনি কে (About), আপনার সাথে যোগাযোগের মাধ্যম (Contact) এবং ইউজারদের ডাটা আপনি কীভাবে সুরক্ষা দিচ্ছেন (Privacy Policy) তা না থাকে, তবে গুগল আপনার সাইটকে প্রফেশনাল মনে করে না।

**সমাধান:** ফুটারে বা মেনুতে অবশ্যই About Us, Contact Us, Privacy Policy, এবং Disclaimer পেজগুলো যোগ করুন।

### ৬. ডোমেইন বয়স এবং এক্সটেনশন

যদিও গুগল বলে ডোমেইন বয়স বড় কথা নয়, কিন্তু একদম নতুন ডোমেইনে (৭-১০ দিন) অ্যাডসেন্স পাওয়া কঠিন। আবার অনেকে .tk, .ml বা ফ্রিতে পাওয়া ডোমেইন ব্যবহার করেন, যা অ্যাডসেন্স পাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

**সমাধান:** চেষ্টা করুন .com, .net, বা .org ডোমেইন ব্যবহার করতে। আর অন্তত ১ মাস সাইটটিকে সময় দিন।

### ৭. ট্রাফিক সোর্স ইস্যু

আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ) থেকে স্প্যামিং করে ট্রাফিক আনেন, তবে অ্যাডসেন্স আপনাকে ব্যান করতে পারে বা রিজেক্ট করতে পারে। গুগল চায় আপনার সাইটে অর্গানিক ট্রাফিক অর্থাৎ গুগল সার্চ থেকে ভিজিটর আসুক।

**সমাধান:** অন্তত প্রতিদিন ২০-৩০ জন অর্গানিক ভিজিটর আসার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভালো। যদিও জিরো ট্রাফিকেও অ্যাডসেন্স পাওয়া যায়, কিন্তু অর্গানিক ট্রাফিক থাকলে অ্যাপ্রুভালের চান্স ৯৫% বেড়ে যায়।

## নতুন ব্লগাররা সাধারণত যে ভুলগুলো করেন

১. **তাড়াহুড়ো করা:** সাইট খুলেই ৩ দিনের মাথায় অ্যাডসেন্সের জন্য পাগল হয়ে যাওয়া।

২. **নিশ সিলেকশনে ভুল:** এমন সব বিষয়ে লেখা যা গুগলের পলিসি বিরোধী (যেমন- ক্র্যাক সফটওয়্যার বা জুয়া)।

৩. **গুগল সার্চ কনসোল অবহেলা:** আপনার সাইট যদি গুগলে ইনডেক্সই না হয়, তবে অ্যাডসেন্স পাবেন কীভাবে?

৪. **এআই (AI) কন্টেন্ট:** সরাসরি চ্যাটজিপিটি দিয়ে লিখে পোস্ট করা। গুগল এআই কন্টেন্ট পছন্দ করলেও সেটা যদি মানসম্মত না হয়, তবে রিজেক্ট করে দেয়।

## সফলভাবে অ্যাডসেন্স পাওয়ার স্টেপ-বাই-স্টেপ সমাধান

আপনি যদি বারবার রিজেক্ট হয়ে থাকেন, তবে নিচের এই ধাপগুলো ফলো করুন:

**ধাপ ১:** সাইটের সব আর্টিকেল চেক করুন। কোনটি ছোট বা কপি করা থাকলে তা ডিলিট করে দিন অথবা আপডেট করুন।

**ধাপ ২:** সাইটের ডিজাইন সিম্পল রাখুন। অপ্রয়োজনীয় উইজেট বা জাভাস্ক্রিপ্ট সরিয়ে ফেলুন।

**ধাপ ৩:** আপনার সাইট Google Search Console-এ ভেরিফাই করুন এবং সাইটম্যাপ সাবমিট করুন। দেখুন সবগুলো পোস্ট ইনডেক্স হয়েছে কি না।

**ধাপ ৪:** অন্তত ১৫ দিন নিয়মিত ১টি করে ইউনিক পোস্ট করুন।

**ধাপ ৫:** সব নিয়ম ঠিক থাকলে আবার অ্যাপ্লাই করুন এবং রেজাল্ট না আসা পর্যন্ত পোস্ট থামাবেন না।

## AdSense Approval Checklist (একনজরে)

 * [ ] ডোমেইন অন্তত ৩০ দিন পুরনো।

 * [ ] সাইটে ২০+ তথ্যবহুল ইউনিক আর্টিকেল আছে।

 * [ ] Privacy Policy, About, Contact পেজ আছে।

 * [ ] ওয়েবসাইট ডিজাইন পরিষ্কার ও মোবাইল ফ্রেন্ডলি।

 * [ ] পোস্টগুলো গুগল সার্চে ইনডেক্স হয়েছে।

 * [ ] কোনো কপিরাইট ইমেজ বা ভিডিও নেই।

 * [ ] কোনো নিষিদ্ধ টপিক (Adult, Hacking, Gambling) নেই।

## FAQ: সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

**১. কতগুলো পোস্ট হলে অ্যাডসেন্স পাব?**

আসলে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তবে ২০-২৫টি কোয়ালিটি পোস্ট থাকলে অ্যাপ্রুভাল পাওয়া সহজ হয়।

**২. বাংলা ভাষায় কি অ্যাডসেন্স পাওয়া যায়?**

হ্যাঁ, বাংলা গুগল অ্যাডসেন্স সাপোর্টেড একটি ভাষা। নিশ্চিন্তে বাংলা ব্লগিং করতে পারেন।

**৩. কপিরাইট ফ্রি ছবি কোথায় পাব?**

Pexels, Pixabay বা Unsplash থেকে ফ্রিতে হাই-কোয়ালিটি ছবি নিতে পারেন।

**৪. একবার রিজেক্ট হলে কি আর পাব না?**

অবশ্যই পাবেন। রিজেক্ট হওয়া মানে হলো আপনার সাইটে কিছু ত্রুটি আছে। সেগুলো ঠিক করে আবার আবেদন করলেই অ্যাপ্রুভ হবে।

**৫. ফ্রিতে পাওয়া ব্লগার (blogspot.com) সাইটে কি অ্যাডসেন্স হয়?**

হ্যাঁ, হয়। তবে কাস্টম ডোমেইন (.com) থাকলে অ্যাপ্রুভাল পাওয়া অনেক বেশি সহজ এবং প্রফেশনাল।

## শেষ কথা: ধৈর্যই সফলতার চাবিকাঠি

বন্ধুরা, অ্যাডসেন্স রিজেকশন মানে আপনার ব্লগিং ক্যারিয়ারের শেষ নয়। এটি কেবল একটি সংকেত যে আপনাকে আপনার কাজের মান আরও একটু বাড়াতে হবে। মনে রাখবেন, গুগল আপনার শত্রু নয়, সে কেবল তার ইউজারদের ভালো অভিজ্ঞতা দিতে চায়। আপনি যদি মানুষের উপকারে আসে এমন কিছু লেখেন, তবে অ্যাডসেন্স আপনার পেছনে দৌড়াবে।

তাই হতাশ না হয়ে আজই আপনার সাইটের ভুলগুলো খুঁজে বের করুন এবং সেগুলো ঠিক করা শুরু করুন। পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না।

**আপনার যদি অ্যাডসেন্স নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকে, তবে নিচে কমেন্ট করে আমাকে জানান। আমি চেষ্টা করব আপনাদে

র সাহায্য করতে। আর আর্টিকেলটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!**

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

Related Articles
About Author

Simple Persion with simple thought