একদা এক দেশে বল্টু নামে এক মহাপুরুষ বাস করত। মহাপুরুষ বলছি কারণ, তার মত অলস এবং অদ্ভুত চিন্তাভাবনা সম্পন্ন মানুষ এই পুরো মহাবিশ্বে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বল্টুর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল—কষ্ট না করে কীভাবে আরাম করা যায়। সে একদিন ইন্টারনেটে একটি বিজ্ঞাপন দেখল, যার শিরোনাম ছিল ঠিক এই গল্পের শিরোনামের মতো। বল্টু ভাবল, "ব্যাস! আমার দিন ফিরে এসেছে।"
বিজ্ঞাপনে ক্লিক করতেই সে দেখল, এক তথাকথিত ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ চিৎকার করে বলছে, "আপনি কি জীবনে সফল হতে চান? আপনি কি চান আপনার পকেটে সবসময় টাকা উপচে পড়ুক? তাহলে আজই কিনুন আমাদের তৈরি বিশেষ 'ডিজিটাল লাড্ডু'!" বল্টু ভাবল, লাড্ডু খেয়ে যদি কোটিপতি হওয়া যায়, তবে মন্দ কি! সে তার শেষ জমানো টাকা দিয়ে সেই লাড্ডু অর্ডার করল।
লাড্ডু রহস্য এবং বল্টুর অভিযান
তিনদিন পর একটা পার্সেল এল। বল্টু অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে প্যাকেট খুলল। ভেতরে গোল একটা মাটির বল, যার গায়ে লেখা—"এটি প্রতিদিন ভোরে খালি পেটে চাটলে আপনার মগজ হবে কম্পিউটারের মতো তেজ আর পকেট হবে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড।" বল্টু সেটা চাটতে শুরু করল। প্রথম দিন তার মনে হলো সে আইনস্টাইন হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দিন তার মনে হলো সে মঙ্গল গ্রহে জমি কেনার সামর্থ্য রাখে। কিন্তু তৃতীয় দিন সকালে উঠে সে দেখল, তার পকেটে টাকা তো আসেইনি, উল্টো তার জমানো সব টাকা ওই লাড্ডু কিনতেই শেষ হয়ে গেছে।
সে তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ওই লাড্ডু কোম্পানির অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অফিসের ঠিকানা ছিল একটা পরিত্যক্ত গ্যারেজের পেছনে। সেখানে গিয়ে সে দেখল, একজন লোক ছেঁড়া লুঙ্গি পরে ল্যাপটপে টাইপ করছে। বল্টু চিৎকার করে বলল, "এই যে ভাই! আপনার ডিজিটাল লাড্ডু খেয়ে তো আমি ফকির হয়ে গেলাম! টাকা কই?"
লোকটি শান্ত গলায় বলল, "ভাই, লাড্ডুর কাজ তো টাকা দেওয়া না, লাড্ডুর কাজ হলো আপনার মনে সাহস দেওয়া। দেখুন, এই লাড্ডু খেয়েই তো আপনি এতদূর আসার সাহস পেয়েছেন! এটাই তো বড় প্রাপ্তি।" বল্টু বুঝল, সে ডিজিটাল জমানার ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়েছে।
চাকরির ইন্টারভিউ এবং বল্টুর উত্তর
ফকির হয়ে বল্টু ভাবল এবার একটা চাকরি করা দরকার। সে গেল এক বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। ইন্টারভিউ বোর্ডে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: — "বলুন তো বল্টু সাহেব, আমাদের কোম্পানির জন্য আপনি কী করতে পারেন?" বল্টু উত্তর দিল, "আমি আপনাদের কোম্পানির এসি বিল কমিয়ে দিতে পারি।" ইন্টারভিউয়ার অবাক হয়ে বললেন, "সেটা কীভাবে?" বল্টু গম্ভীর মুখে বলল, "আমি অফিসে এলে কাজ করব না, শুধু ঘুমাব। আর মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তার শরীর থেকে তাপ কম বের হয়। ফলে এসি কম চললেও চলে।"
বোর্ড মেম্বাররা একে অপরের দিকে তাকালেন। বস বললেন, "ঠিক আছে, আপনি কি জানেন টিমওয়ার্ক কাকে বলে?" বল্টু হাসিমুখে বলল, "অবশ্যই! মনে করুন, আমরা চারজন মিলে একটা ভারি পাথর তুলছি। তিনজন মিলে যখন পাথরটা তুলবে, আমি তখন পাশ থেকে চিৎকার করে বলব—সাবাস! জোরে হেইও! এই উৎসাহ দেওয়াটাই হলো আসল টিমওয়ার্ক।"
বলাই বাহুল্য, বল্টু সেই চাকরিটা পায়নি। কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ঠিক করল সে নিজেই একটা ব্যবসা শুরু করবে। ব্যবসার নাম দিল—"অলসদের স্বর্গরাজ্য।"
অলসদের স্বর্গরাজ্য: একটি অভিনব স্টার্টআপ
বল্টুর আইডিয়া ছিল চমৎকার। যারা অনেক অলস, তাদের হয়ে সে অলসতা করবে। ধরুন, কারো খুব ইচ্ছা করছে সারাদিন সোফায় শুয়ে থাকতে কিন্তু অফিসের চাপে পারছে না। বল্টু টাকার বিনিময়ে ওই লোকটির হয়ে সোফায় শুয়ে থাকবে এবং লোকটিকে মানসিকভাবে শান্তি দেবে যে, "আপনার প্রতিনিধি হিসেবে আমি যথেষ্ট আরাম করছি।"
শুনতে হাস্যকর মনে হলেও, আশ্চর্যের বিষয় হলো বল্টুর এই স্টার্টআপ বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেল। শহরের ধনী অলসেরা তাকে ভাড়া করতে শুরু করল। কেউ হয়তো জিমে যেতে আলসেমি করছে, বল্টু তাকে বলল—"ভাই, আপনি টাকা দিন, আপনার হয়ে আমি জিমে গিয়ে বেঞ্চে শুয়ে থাকব। ব্যায়ামের কষ্ট আমার, ফিটনেস আপনার কল্পনায়!"
বল্টু ধীরে ধীরে বড়লোক হতে শুরু করল। কিন্তু তার জীবনে শান্তি ছিল না। কারণ এখন সে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, নিজের জন্য আর অলসতা করার সময় পাচ্ছে না। সে বুঝতে পারল, অলসতাও আসলে একটা বিলাসিতা।
উপসংহার: বল্টুর নতুন উপলব্ধি
গল্পের শেষে বল্টু তার সেই 'ডিজিটাল লাড্ডু' বিক্রেতার কাছে ফিরে গেল। এবার সে তাকে মারতে নয়, বরং ধন্যবাদ দিতে গেল। সে বলল, "ভাই, আপনার ওই ফালতু লাড্ডু না থাকলে আমি আজ এই সফল বিজনেসম্যান হতে পারতাম না। আপনি আমাকে শিখিয়েছেন যে, দুনিয়ায় বোকা মানুষের অভাব নেই, শুধু সঠিক উপায়ে তাদের পকেট খালি করতে জানতে হয়।"
বল্টু এখন শহরের সবচেয়ে বড় মোটিভেশনাল স্পিকার। সে এখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে চিৎকার করে বলে, "আপনারা কি অলস হতে চান? আপনারা কি চান জীবনটাকে উপভোগ করতে? তাহলে আজই সাবস্ক্রাইব করুন আমার চ্যানেলে!"
বল্টুর এই গল্প আমাদের শেখায় যে, বুদ্ধি থাকলে ঘাস বেচেও যেমন রাজা হওয়া যায়, তেমনি অলসতা বেচেও কোটিপতি হওয়া সম্ভব। তবে মনে রাখবেন, এই গল্পের শিরোনামের মতো কোনো লিংকে ক্লিক করে আবার কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন না!
গল্পের বর্ণনা: এই গল্পটি মূলত একটি স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক রচনা। এখানে আমাদের সমাজের হুজুগ এবং ইন্টারনেটের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের প্রতি মানুষের অন্ধ বিশ্বাসকে হাস্যকরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বল্টু চরিত্রটি আমাদের সবার মাঝেই কম-বেশি আছে, যে কি না শর্টকাটে সফল হতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে যে, পরিশ্রম বা বুদ্ধির সঠিক প্রয়োগ ছাড়া প্রকৃত সফলতা আসে না (যদিও সে একটু বাঁকা পথে সফল হয়েছে)।
You must be logged in to post a comment.